ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিড এ নিতে খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তারা। আগে বরিশাল পর্যন্ত লাইনের প্রস্তাব করা হলেও তাতে আসল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না বলে মত তাদের।
ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিড এ নিতে পাইপলাইন হবে খুলনা পর্যন্ত
সম্প্রতি ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে বরিশাল পর্যন্ত পাইপলাইন করার প্রস্তাব দেয় গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)। বরিশালে জাতীয় গ্যাস গ্রিড লাইন না থাকায় ভোলার গ্যাস ওই পর্যন্ত গেলেও দেশের চলমান গ্যাস সংকটের কার্যত কোনো সমাধান হবে না। এ কারণে চলতি মাসের শুরুতে এ-সংক্রান্ত এক সভায় খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের পরামর্শ দেওয়া হয়। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানান।
জিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী রুখসানা নাজমা ইছহাক কালবেলাকে বলেন, ভোলার গ্যাস খুলনায় নিয়ে গেলে ভালো হয়। বরিশাল পর্যন্ত প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু এখন এই পাইপলাইন খুলনা পর্যন্ত করার বিষয়ে সবাই মতামত দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আগামী সপ্তাহে অভ্যন্তরীণ সভা হবে। প্রাক্কলিত ব্যয় কত হতে পারে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হবে। তারপরই বলা যাবে ব্যয়ের পরিমাণ কত হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, গত ৪ নভেম্বর শিল্প শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে এ সংক্রান্ত পর্যালোচনা সভা হয়। সেখানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) এবং জ্বালানি, খনিজ সম্পদসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভার কার্যপত্র থেকে জানা যায়, অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তারা বরিশালের পরিবর্তে ভোলা থেকে খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের পক্ষে মত দেন। তাদের মতে, বরিশাল পর্যন্ত নির্মাণ করলে বিনিয়োগ কার্যকর হবে না।
জিটিসিএলের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, ‘ভোলা-বরিশাল গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। চার বছর মেয়াদি প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬২৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। সম্পূর্ণ বিদেশি অর্থায়নে এটি নির্মাণ করার প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। এজন্য বৈদেশিক ঋণ খুঁজতে পরিকল্পনা কমিশনে প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছে জিটিসিএল।
পর্যালোচনা সভার শুরুতে শিল্প শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভোলায় উত্তোলনযোগ্য গ্যাস দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। গ্যাস আমদানি করে ব্যবহারের চেয়ে স্থানীয় উৎস থেকে ব্যবহার অধিক লাভজনক। ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় স্বার্থে কীভাবে ব্যবহার করা যায় এবং ভবিষ্যতে কী পরিমাণ গ্যাস প্রাপ্তি বা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে, সে বিষয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বর্তমানে চাহিদা না থাকায় শাহবাজপুর গ্যাস ক্ষেত্র থেকে প্রায় ৪০-৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম উত্তোলন করা হচ্ছে। তা ছাড়া প্রস্তাবিত প্রসেস প্লান্টের মাধ্যমে দৈনিক অতিরিক্ত আরও ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হবে। ফলে উৎপাদিত গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করাই সমীচীন হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবের বিষয়ে জিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী রুখসানা নাজমা ইছহাক সভায় বলেন, বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী ভোলার শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ ও ইলিশা গ্যাসক্ষেত্র থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত দৈনিক ২৪১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের প্ৰক্ষেপণ করা হয়েছে। বর্তমানে শাহবাজপুর গ্যাস ফিল্ডের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ভোলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে দৈনিক ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের পরও তিনটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৬১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ এবং সম্ভাব্য গ্যাস রিজার্ভ বিবেচনায় ভোলা-বরিশাল গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ করা প্রয়োজন। শিল্প ও শক্তি বিভাগের প্রধান মো. ইউনুছ মিয়া বলেন, ভোলা থেকে বরিশাল পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করা হলে আপাতত কাজে আসবে বলে মনে হয় না।
এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কার্যকর করতে হলে খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ করে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, পিডিপিপিতে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ের ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ, জিওবি ও নিজস্ব অর্থায়নের বিষয় স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সভার সভাপতি বলেন, প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (পিডিপিপি) প্রকল্প ব্যয়ের ব্রেক ডাউন দিতে দেওয়া, বৈদেশিক ঋণ, জিওবি ও নিজস্ব অর্থায়নের সুস্পষ্ট বিভাজন পিডিপিপিতে সংযোজন করা, পাইপলাইন নির্মাণের ব্যয়সহ সব আনুষঙ্গিক বিষয় টেকনিক্যাল এক্সপার্টের পরামর্শ নিতে হবে।
সভায় উপস্থিত ইআরডির কর্মকর্তা বলেন, ভোলা থেকে খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণই যথাযথ। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারাও এ সিদ্ধান্তকে যথোপযুক্ত বলে মত দেন। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সঞ্চালনের জন্য খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ করাই যৌক্তিক হবে।
সভাপতি বলেন, ভোলায় এরই মধ্যে সম্ভাবনাময় মোট ২৮টি কূপ রয়েছে। সেক্ষেত্রে পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হলে তা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব।

বিস্তারিত আলোচনা শেষে সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভোলা-বরিশালের পরিবর্তে ভোলা-বরিশাল-খুলনা গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি এ আলোকে পিডিপিপি পুনর্গঠন করা, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস উল্লেখপূর্বক সুনির্দিষ্টভাবে ব্যয় বিভাজন উল্লেখ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। সঙ্গে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী আর্থিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ পুনঃপরীক্ষাপূর্বক নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়।
উল্লেখ্য, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে ঢাকা আনতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিশেষ বিধানের আওতায় উচ্চ দামে ইন্ট্রাকোকে অনুমতি দেওয়া হয়। বিভিন্ন কোম্পানি ভোলার গ্রাস সিএনজিতে রূপান্তর করে বিক্রি অনুমতি চাইলেও দেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হওয়ায় কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটিকে এ কাজ দেওয়া হয়।