ভোলা, বাংলাদেশের একটি দ্বীপ জেলা হিসেবে খ্যাত হলেও এর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাচীন। স্রোতস্বিনী মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার কোলঘেঁষা এই জেলা যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, তেমনি এর মাটিতে গড়ে উঠেছে এক রঙিন ও প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভোলার সংস্কৃতি চর্চা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ছিল বিশিষ্ট।

ইতিহাস ও সূচনা: যাত্রা–নাটকের উজ্জ্বল দিনগুলি
পঞ্চাশের দশকে বিদ্যুৎ না থাকায় হ্যাজাকের আলোয় গ্রামীণ জনপদে যাত্রাপালা, পালাগান ও নাটকের আয়োজন ছিল নৈমিত্তিক। এই ধরণের পরিবেশনায় গ্রামের মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল যাত্রাদল ও নাট্যদল।
🎭 প্রধান ধারা:
| ধরণ | বিবরণ |
| যাত্রা | গ্রামীণ পরিবেশে প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা |
| পালাগান | সংগীত ও কাব্যের মিশ্রণ, গল্পনির্ভর গীতিনাট্য |
| নাটক | সামাজিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটভিত্তিক |
প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনসমূহ
ভোলার সাংস্কৃতিক জগতে ধারাবাহিকতা ও শৃঙ্খলা আনতে গড়ে উঠেছিল একাধিক সংগঠন:
🏛️ সংগঠন তালিকা:
| সংগঠন | ধরন | বিশেষত্ব |
| শিল্পী নিকেতন | সংগীতভিত্তিক | ভোলার প্রথম সংগীত সংগঠন |
| মেঘনা শিল্পী সংসদ | নাট্যভিত্তিক | নাটক প্রযোজনা ও মঞ্চায়নে অগ্রণী ভূমিকা |
| সৃজনী সংসদ | নাট্য ও সাহিত্য | মঞ্চনাটক ও সাহিত্য চর্চা |
এই সংগঠনগুলোর কার্যক্রম বর্তমানে তুলনামূলকভাবে স্থবির হলেও, সাংস্কৃতিক প্রাণ এখনও সচল রয়েছে নতুন প্রজন্মের সংগঠনগুলোর মাধ্যমে।
বর্তমান সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল
বর্তমানে ভোলায় সক্রিয় রয়েছে বেশ কিছু নতুন সংগঠন, যারা নিয়মিতভাবে আবৃত্তি, নাটক, সংগীত ও সাহিত্যচর্চায় অংশ নিচ্ছে।
✨ বর্তমানে সক্রিয় কিছু সংগঠন:
- বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠী
- আবৃত্তি সংসদ
- ভোলা থিয়েটার
- উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী
- জেলা শিল্পকলা একাডেমি
- শিশু একাডেমি
শিল্পকলা একাডেমির ভূমিকা
ভোলা জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমি বর্তমানে জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এই একাডেমির প্রথম নির্বাচিত সম্পাদক অধ্যক্ষ জনাব আফসার উদ্দিন বাবুল, যিনি একাধারে:
- শিল্পী
- সুরকার
- গীতিকার
- সাংবাদিক
- ফাতেমা খানম কলেজের অধ্যক্ষ
উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
🎙️ সাংস্কৃতিক কীর্তিমানদের নাম:
| নাম | অবদান / পরিচয় |
| মনজুর আহমেদ | সঙ্গীতশিল্পী |
| সাথী করঞ্জাই | গায়িকা |
| রেহানা ফেরদৌস | নাট্যশিল্পী |
| মৃদুল দে | গায়ক |
| অতুনু করঞ্জাই | নাট্যকর্মী |
| জিয়া | আবৃত্তিকার |
| শামস-উল আলম মিঠু | নাট্য ও সঙ্গীত কর্মী |
| ফারজানা আফসার লিয়ানা | জাতীয় পর্যায়ে ৫টি স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত শিশু শিল্পী (১৯৮৭–২০০৩) |
| মনিরুল ইসলাম | অভিনয়শিল্পী |
স্মরণীয় প্রয়াত শিল্পীবৃন্দ
ভোলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যারা আজ আর নেই, কিন্তু রেখে গেছেন অনন্য অবদান:
- 🎼 গুরুদাস নাগ – ওস্তাদ সঙ্গীত শিল্পী
- 🎼 মন্টু তালুকদার – ওস্তাদ সঙ্গীত শিল্পী
- 🎤 হেলাল উদ্দিন আহমেদ (ফেলু মিয়া) – সংগীতশিল্পী ও সংগঠক
সাহিত্য ও নাট্যচর্চায় প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব
✍️ সাহিত্য ও নাট্যশিল্পে অবদান রেখেছেন:
- মোশারেফ হোসেন শাজাহান – সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী; ষাট দশকে খ্যাতিমান নাট্যকার, সাহিত্যিক ও অভিনেতা
- অধ্যক্ষ ফারুকুর রহমান, আনোয়ার হোসেন, কালীপদ দে, রতন চৌধুরী, আবদুল লতিফ, মাখন ঘোষ, শামিত্ব ঘোষ, সাবেরুল করিম চৌধুরী – ষাটের দশকের প্রভাবশালী অভিনয়শিল্পী

ভোলা জেলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল অতীতের শেকড় থেকে গড়ে উঠলেও এর বর্তমানও সমানভাবে গৌরবোজ্জ্বল। ঐতিহ্যবাহী যাত্রা, পালাগান, নাট্যচর্চার ধারাবাহিকতা এখনও নতুন প্রজন্মের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে। অতীতের কীর্তিমানদের অবদান যেমন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়, তেমনি বর্তমানে সক্রিয় সংগঠনগুলোর প্রতি রয়েছে উন্নয়নের বড় প্রত্যাশা।
ভোলা যেন শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের এই প্রাণপ্রবাহ বজায় রেখে আগামী প্রজন্মকে সংস্কৃতিমনস্ক, মানবিক ও সৃজনশীল করে তুলতে পারে—এই প্রত্যাশা সবার।
১ thought on “ভোলা জেলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল”