বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত বৃহত্তম দ্বীপভিত্তিক জেলা ভোলা, যার নামকরণ ও ইতিহাস একান্তভাবে জড়িত রয়েছে স্থানীয় লোককথা, নদীভূগোল, ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক বিবর্তন এবং বিভিন্ন সময়ের উপনিবেশবাদী আক্রমণের সঙ্গে। এই জেলার নামকরণকে কেন্দ্র করে যেমন একটি জনপ্রিয় জনশ্রুতি রয়েছে, তেমনি আছে ঐতিহাসিকভাবে প্রামাণ্য নথির ভিত্তিতে বিবর্তনের দলিল।
ভোলা জেলার নামকরণের ইতিহাস

🏝️ ভোলা নামের জনশ্রুতি:
ভোলার নামকরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে একটি হৃদয়স্পর্শী কাহিনি প্রচলিত রয়েছে।
ভোলা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বেতুয়া খাল এক সময় বেশ প্রশস্ত ছিল এবং বেতুয়া নদী নামে পরিচিত ছিল। সে সময় নদী পারাপারে খেয়া নৌকার প্রচলন ছিল।
- একজন বৃদ্ধ মাঝি, যার নাম ছিল ভোলা গাজি পাটনি, এই খেয়া নৌকা চালাতেন।
- তিনি আজকের যুগীরঘোল এলাকার আশেপাশে বসবাস করতেন এবং লোকজনকে পারাপার করতেন।
- স্থানীয় জনগণের বিশ্বাস, এই ভোলা গাজির নাম অনুসারেই পরবর্তীতে অঞ্চলটির নাম হয় ভোলা।
✳️ এই কাহিনি থেকে বোঝা যায়, এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনধারা, নদী-কেন্দ্রিক জীবনযাত্রা এবং স্থানীয় বীরদের স্মৃতিই নামকরণের মূল উৎস।

🗺️ ভোলা জেলার পুরাতন নাম ও প্রশাসনিক বিবর্তন
ভোলা জেলার পূর্বনাম ছিল “দক্ষিণ শাহবাজপুর”। প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চল ছিল সমুদ্রজয়ী জলদস্যুদের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। সময়ের পরিক্রমায় এটি একাধিক প্রশাসনিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে।
📜 ঐতিহাসিক বিবরণ:
| সময়কাল | গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা |
| ১২৩৫ খ্রিস্টাব্দ | দ্বীপ গঠনের সূচনা (জে.সি. জ্যাক, বাকেরগঞ্জ গেজেটিয়ার অনুযায়ী) |
| ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ | এই অঞ্চলে চাষাবাদ শুরু |
| ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ | পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের আগমন ও ঘাঁটি স্থাপন |
| ১৮২২ খ্রিস্টাব্দ | দক্ষিণ শাহবাজপুর ছিল বাকেরগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত |
| ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ | ভোলা অন্তর্ভুক্ত হয় বরিশাল জেলার মহকুমা হিসেবে |
| ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দ | প্রশাসনিক সদর দফতর দৌলতখান থেকে ভোলায় স্থানান্তরিত হয় |
| ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দ | ভোলা পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় |

🏞️ ভৌগোলিক ও নদীভিত্তিক বিবর্তন
ভোলার প্রশাসনিক ইতিহাস ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত মেঘনা নদীর পরিবর্তনশীল প্রবাহের সঙ্গে।
১৯ শতকে মেঘনা নদীর ব্যাপক সম্প্রসারণের ফলে বাকেরগঞ্জ জেলার সাথে দক্ষিণ শাহবাজপুরের যোগাযোগ দুরূহ হয়ে পড়ে।
ফলে সরকার দক্ষিণ শাহবাজপুর ও হাতিয়াকে নোয়াখালী জেলার অধীনে আনে। পরবর্তীতে প্রশাসনিক সুবিধার্থে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় বরিশাল জেলায়।
🧭 ভোলা জেলার প্রশাসনিক বিবর্তন:
| সময়কাল | অবস্থান ও মর্যাদা |
| ১৮২২ পর্যন্ত | বাকেরগঞ্জ জেলার অংশ |
| ১৮৬৯ সাল পর্যন্ত | নোয়াখালী জেলার অন্তর্ভুক্ত |
| ১৮৬৯ সাল | বরিশাল জেলার মহকুমা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত |
| ১৮৭৬ সাল | সদর দফতর দৌলতখান থেকে ভোলায় স্থানান্তর |
| ১৯৮৪ সাল | ভোলা জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় |
🧭 ঐতিহাসিক ভূমিকায় ভোলা
- ভোলা ছিল এক সময়ের জলদস্যু ও উপনিবেশবাদীদের ঘাঁটি, বিশেষ করে মগ ও পর্তুগিজদের।
- এ অঞ্চলের কৌশলগত অবস্থান এবং উর্বর মাটি এর জনপ্রিয়তা বাড়ায়।
- ঔপনিবেশিক শাসনামলে বারবার প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের শিকার হয় ভোলা।
ভোলার নামকরণ ও প্রশাসনিক ইতিহাস শুধু একটি ভূখণ্ডের নাম পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং তা বাংলাদেশের উপকূলীয় ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, উপনিবেশবাদ ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিবর্তনের প্রতিচ্ছবি।
ভোলা গাজির কাহিনি যেমন এক মানবিক ও স্থানীয় চেতনাকে প্রতিনিধিত্ব করে, তেমনি ভোলার প্রশাসনিক রূপান্তর বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
📚 তথ্যসূত্র
- বাকেরগঞ্জ গেজেটিয়ার – জে.সি. জ্যাক
- বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভ
- স্থানীয় ইতিহাস গবেষণা ও জনশ্রুতি
- বাংলাদেশ প্রশাসনিক ইতিহাস সংকলন
১ thought on “ভোলা জেলার নামকরণের ইতিহাস”